www.jhalokathisomoy.com
মুক্তচিন্তার অনলাইন সংবাদপত্র, ঝালকাঠি, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫
শিরোনাম

মফস্বলে তরুণদের সাংবাদিকতা

সম্পাদকীয় | November 12, 2018 - 10:15 am

চাল-ডাল-তেল-নুনের মতো সংবাদও যেন মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদা হয়ে উঠছে। অ্যামাজানের জঙ্গল থেকে হোয়াইট হাউজ অথবা দেশের নিভৃত গ্রামের ঘটে যাওয়া ঘটনাটি এখন মুহূর্তের মধ্যে জানতে চায় মানুষ। মানুষের চাহিদার তাগিদে দ্রুততার সাথে সঠিক তথ্যটি গণমাধ্যমে তুলে ধরতে সংবাদকর্মীকে যন্ত্র হয়ে উঠতে হচ্ছে।

দেশের সংবাদপত্রের এক সময়কার স্লোগান ছিল ‘ আমরা সত্যের পক্ষে’ , ‘অন্যায়কে ভয় পাই না আমরা, ‘সত্য প্রকাশে আমরা আপোষহীন’, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ দৈনিক’ ‘অন্যায়ের বিরুদ্ধে শাণিত স্লোগান’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, সামাজিক ইতিবাচক পরিবর্তন কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাই ছিল সংবাদপত্রের প্রধান লক্ষ্য। সেই সাথে মতামত প্রকাশ ও সাহিত্যও সমৃদ্ধ ছিল।

এখন সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম আরও বিস্তৃত, দায়িত্বশীল, আধুনিক এবং প্রযুক্তি নির্ভর হয়েছে। বাংলাদেশের একটি সংবাদপত্রের স্লোগান এরকম-‘পক্ষ, বিপক্ষ এবং প্রতিপক্ষের কাগজ।‘ আরেকটি বেসরকারি টেলিভিশনের স্লোগান ‘সংবাদ নয় সংযোগ।‘

সংবাদ সংগ্রহ করে প্রকাশ কিংবা সম্প্রচারের জন্য যে সময়টুকুন লাগে তার জন্যও বসে থাকতে চাইছে না পাঠক-দর্শক কিংবা শ্রোতা। তাই সাথে সাথেই যেন ঘটনার কাছে মানুষকে পৌঁছে দিতে হচ্ছে। তবে কাজটি অত্যন্ত কষ্টকর, ব্যয়সাপেক্ষ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা বা মেধামননের সংযোগ।

রাজধানীসহ সারাদেশে অগণিত তরুণ মেধাবী এখন সংবাদ সংগ্রহের যুদ্ধে সমানে লড়ে যাচ্ছেন, নিজেদের সবটুকু বিলিয়ে দিয়ে। আর তরুণদের জন্য পেশা কিংবা সৃজনশীল চর্চার সুযোগও তৈরি হয়ে গেছে আজকের আধুনিক গণমাধ্যমের যুগে। তবে মফস্বল বা জেলা পর্যায়ে একজন তরুণ সংবাদকর্মীকে সীমাহীন সংকট আর প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এ লড়াইয়ে কেউ কেউ টিকে যায়, তবে হারিয়ে যায় অনেকে।

এক সময় লেখক, কবি, শিক্ষক, আইনজীবী, কিংবা স্বচ্ছল পবিবারের সমাজসেবক কিংবা মুক্তমনের মানুষরা সাংবাদিকতা করতেন। খবর জানানো, সমাজ পরিবর্তন কিংবা সাহিত্যে অথবা মুক্ত মতামত প্রকাশই ছিল ধ্যান। আজকের মতো জীবিকার জন্য সাংবাদিকতা তখন করত না। যদিও প্রযুক্তির এখনাকার অবস্থা না থাকায় সে সময়কার চাহিদাও ছিল তেমন।

মফস্বলের সংবাদ তো বাদই দিলাম, রাজধানীর একটি আলোচিত ঘটনাও দু-একদিন পরে সংবাদ মাধ্যমে এলে খুব বেশি দোষ ধরা যেত না। একজন মফস্বল সংবাদকর্মী পত্রিকা অফিসে ডাকযোগেই সাধারণত সংবাদ পাঠাতেন। এর আগে সংবাদ সংগ্রহে হয়তো আরো দুদিন লাগত তার। জীবিকার জন্য মূল পেশায় সময় দিয়ে ফাঁকে ফাঁকে সাংবাদিকতা করতেন। এজন্য অর্থ ব্যয়েরও খুব বেশি ব্যাপার ছিল না। আর সে সময়ে সাংবাদিকদের কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পয়সাকড়ি দেওয়ার রেওয়াজ থাকলে তা সম্মানী ভাতা হিসেবেই বলা হত। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে- বেতন।

ইন্টারনেট, মোবাইল আর থ্রিজির যুগে স্থানীয় ভাবে পাওয়া খবরের তথ্য-ছবি কিংবা ভিডিও ফুটেজও তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। যতই প্রত্যন্ত অঞ্চলের ঘটনা হোক না কেন, খবর পৌঁছে দিতে হচ্ছে নগদ নগদ। প্রযুক্তির এই বিপ্লব পৌঁছে গেছে প্রায় সব মানুষের কাছে। আর এতে সংবাদকর্মীকে সংবাদিকতায় লেগে থাকতে হচ্ছে প্রতিক্ষণ।

সব কাজ বাদ দিয়ে সাংবাদকর্মীকে সংবাদ সংগ্রহসহ প্রচার বা প্রকাশ উপযোগী করে তৈরি করে প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে অনেকটা সময়ও ব্যয় করতে হচ্ছে। সাংবাদিককে ঘটনাস্থলে যেতে হচ্ছে, ছবি নিতে হচ্ছে, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবইল ফোন আর বিদ্যুৎ খরচ মিটিয়ে আর সময় ব্যয় করে সংবাদটি জমা দিতে হচ্ছে। স্বচ্ছল মানুষ ছাড়া সবাইকেই জীবিকার জন্য কোন পেশায় থাকতে হয়। ঐ প্রতিষ্ঠান থেকে হুট করে ছুটি-ছাটা নেওয়াও সম্ভব নয়। আর এসব ঘটনা ডাকযোগে দু’দিন পরে পাঠানোর দিনও আজ নেই ।তাই এখন সাংবাদিক হতে হলে সাংবাদিকতাকেই প্রধান পেশা হিসেবে নিতে হচ্ছে। এছাড়া সাংবাদিকতা করা সম্ভাব নয়। তাই মফস্বলে একদল তরুণকে সব সময় মাঠেঘাটে সাংবাদিকতার কাজ করতে দেখা যায়।

প্রযুক্তি জ্ঞানেও তরুণ এগিয়ে আছে। বয়সে ও পেশায় সাংবাদিক-গুরুরা তরুণদের সংগ্রহ করা ভিডিও কিংবা ঘটনার তথ্য নিয়ে নিজের মুন্সিআনা রক্ষা করেন। অথচ ঘটনাস্থলে মোড়লদের দেখা যায় না। ওনারা এখন ফোনেই সব কাজ করেন। তবু তরুণ সাংবাদিকদের টিকে থাকতে সিনিয়রদের সেলামি দিয়েই চলতে হয়।

কোন এক সময় গণমাধ্যমে লিখতে দেখা যেত, ‘নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক এলাকাবাসী জানান/ একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে বা সমাজের বিবেকবান মহলের দাবি বিষয়টি এভাবে সুরহা করা উচিত…। এখন সাংবাদিকতায় সাংবাদিকের ব্যক্তিগত মতামত, অভিমত, তদন্ত প্রতিবেদন সংবাদে দেওয়া যায় না। এখন কোন একটি অনিয়মের সংবাদ তুলে ধরতে গিয়ে ঘটনাস্থলে যেতে হচ্ছে, ফোনে অথবা সাক্ষাতে অভিযুক্তের বক্তব্য, ক্ষতিগ্রস্তসহ এলাকাবাসীর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও নিতে হচ্ছে। ফলে সাংবাদিকের জন্য বিপদ পথে পথে। অভিযুক্ত ধরে নেন সাংবাদিক তার প্রতিপক্ষ। যথাযথ কর্তৃপক্ষও মনে করেন আসলে এগুলো কোন সংবাদই নয়। এগুলো প্রচার মানেই তাদের দায়িত্বহীনতা বা অবহেলা কিংবা দুর্নীতি বেরিয়ে আসতে পারে। আর এতে করে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষেরও রোসানলে পড়তে হচ্ছে সাংবাদিক। তাই হামলা মামলায় প্রায় প্রতিনিয়তই নির্যাতিত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। আর তাদের মধ্যে দেখা যাবে তরুণ সাংবাদিকরাই বেশি। তবে কোন কালে কোন দেশেই সাংবাদিকতার পথ মসৃণ ছিল না। বর্তমানে আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প-এর রোষানল, সৌদি আরবে হত্যা, মিয়ানমারে কারাবাসসহ সারা বিশ্বে সাংবাদিকরা নানা নির্যাতনের মুখে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অন্যান্য সংকট ছাড়াও আমাদের দেশে জেলা পর্যায়ে সাংবাদিকতায় আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা সাংবাদিকতায় অর্থের যোগান নিয়ে। দেশের গণমাধ্যমের হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া প্রায় সবাই তার জেলা প্রতিনিধিকে বেতন ভাতা দিতে পারছেন না। ফলে জেলার জেষ্ঠ্য সাংবাদিকরা অন্য সব পেশার সাথে সাংবাদিকতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বেসরকারি টেলিভিশনসহ অনেক দায়িত্বশীল গণমাধ্যম তরুণদেরই জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছে। তবে এরকম গণমাধ্যমে সংখ্যা হাতে গোনা। আর তারাও যে বেতন-ভাতা দেয় তা দিয়ে সংসার চালানো যায় না। জীবিকার এই অনিশ্চয়তার কারণে পরিবার বা অভিভাবকও তরুণদের সাংবাদিকতা লেখাপড়া বা আয় বাণিজ্যে যাওয়ার আগের মুহূর্তেকেই বোঝেন। আর এ কারণে সম্ভাবনা থাকলেও তরুণরা এক সময় জীবিকার কারণে সাংবাদিকতা পেশা থেকে ঝরে পড়তে বাধ্য হয়। যে তরুণ অনেক কষ্ট করে সাংবাদিকতা ধরে রাখেন তাকেও একদিন জীবিকার জন্য নতুন করে পেশা আঁকড়ে ধরতে হয়। তখন সাংবাদিকতা তার কাছেও হয় পার্শ্ব পেশা।

লেখক: পলাশ রায়, সম্পাদক ঝালকাঠি সময়

মুক্তচিন্তার যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সাইটের তথ্য বা ছবি ব্যবহার করতে পারবেন, তবে সে ক্ষেত্রে তথ্য সূত্র উল্লেখ করতে হবে-সম্পাদক ঝালকাঠি সময়।