www.jhalokathisomoy.com
মুক্তচিন্তার অনলাইন সংবাদপত্র, ঝালকাঠি, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫
শিরোনাম

‘দীপক চন্দ্র গুহ’ এক মানবিকজন…

মিলন কান্তি দাস | November 10, 2018 - 6:25 pm

আটাশি সালের দিকে মানুষটির সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় আত্মীয়তার সুবাদে। কেন জানি না দেখার পর থেকেই তাকে ভালো লাগে । তাদের বাড়িতে গেলে গল্প,আনন্দ আর খাওয়া দাওয়ার মাঝে চলতো তাস খেলা। একদিনের কথা বরিশাল বনাম পাবনার সাথে ব্রীজ খেলা চলছে। পাবনা টিমের অবস্থা যখন শোচনীয় ঠিক তখনই ওই মানুষটি এসে একজনকে উঠতে বলে নিজেই বসে গেল পাবনা টিমের পক্ষে খেলতে। সে মানুষটি সম্পর্কে নানা জনের কাছে নানান কথা শুনতে লাগলাম । তার বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে অনেকের সাথে কথা হয়েছিল । ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানোর কারণে কেউ কেউ তাকে ভিন্ন চোখে দেখতে বলেও শুনলাম । কিন্তু আমি মানুষটির মানবিক খুনের কথা শুনে কখন যেন নিজের হৃদয়ের গভীরে স্থান দিয়ে ফেললাম । এই মানবিক মানুষটি নিজের জমির ফসল বিক্রি করা টাকা দিয়ে কখনো কারোর মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন আবার কারো ফরম ফিলাপ করতে না পারা ছেলে বা মেয়েটির লেখাপড়া করানোর দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছেন । কারো ঘর করে দেওয়া কিংবা খাবারের অভাবে থাকা পরিবারটির পাশে খাবার নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন।  এইসব মানবিক গুণগুলির কথা শুনে দূরের একটা দোষের কথা আমাকে তার থেকে দুরে সরাতে পারেনি । এমনই করেই তার সাথে বন্ধুনটি দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয় । আসে দুই হাজার ছয় সাল,বছরটি আমার বিয়ের বছর। তাকে আমার নতুন জীবনের সব অনুষ্ঠানে থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানাই। বিয়ের দুদিন আগেই চলে আসেন নলছিটিতে এবং নিজেই অনেক দায়িত্ব তুলে নেন তার কাঁধে । সেদিন মনে হয়েছিল যেন নিজের ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন । বিয়ের কাজ শেষে নলছিটিতে বৌভাতের অনুষ্ঠান শেষে একদিন নিজের হাতে রান্না করে খাওয়ালেন বাড়ি ভর্তি আত্মীয় স্বজনেরে । এরপর থেকে মানুষটিকে আরো ভালোবাসতাম, সেও মাঝেমধ্যে তার কথাও শেয়ার করতো আমার সাথে ।

আজ স্মৃতিপটে অনেক কথাই ভেসে উঠছে । তার বড়ো ছেলের ঘরের একমাত্র নাতিটি লেখাপড়ায় খুব ভালো তাই ওকে নিয়ে তার গর্বের শেষ নেই। আর আমি শিক্ষকতা করি বিধায় আমার উপর তার অগাধ আস্থা আর বিশ্বাস ছিল। তিনি একদিন বললেন আমার মেয়ের ঘরের নাতি-নাতনিরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হলো এবার যদি ছেলের ঘরের একটা ইঞ্জিনিয়ার হতো তাহলেই আমার আশা পূর্ণ হতো। সেদিন মন থেকেই বলেছিলাম আপনি আশীর্বাদ করুন আপনার এই নাতিটি আপনার আশা পুরণ করবে। এরপর নাতিটি ঢাকার মনিপুর স্কুল থেকে জিপিএ পাঁচ পেলে আর আকাংখা আরো বেলে যায় । ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় আবার জিপিএ পাঁচ পেলে তার ইচ্ছের বিষয়টি নিয়ে আবারও আমার সাথে দীর্ঘ ফোনালাপ হতে থাকে। ফোনালাপের কারন হলো উনি তখন আমেরিকা প্রবাসী । আমাকে বললেন জানো বাবা এই বয়সেও আমি বসে না থেকে কাজ করছি শুধু আমার ইচ্ছে পূরণের জন্য । যাতে নাতিটির লেখাপড়ার খরচের জন্য কারো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয় । সুদূর প্রসারী চিন্তা চেতনা ছিল তার হৃদয়ের গভীরে । নাতিটি খুব সামান্য নম্বর কম পেলে সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় । এরপর নাতিটি ভারতের একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে বৃত্তি পেলে তিনি আবারও আমাকে ফোন করেন। দীর্ঘ ফোনালাপ তার মনের ইচ্ছের কথা গুলো আবার আমাকে বলেন। তার খুব ইচ্ছে এই নাতিটি ইঞ্জিনিয়ার হোক এবং আমি যেন একটু বুঝিয়ে বলি। তার বিশ্বাস ছিল আমি বুঝিয়ে বললে তার নাতি কথা শুনবে। নাতিটি কোলকাতায় পড়তে গেল বৃদ্ধ মানুষটির ঘাম ঝড়ানো উপার্জিত টাকা দিয়ে কখনো দামি ল্যাপটপ কখনো দামি বাইক কখনো বা আই ফোন । নাতিটি কোলকাতায় পড়াশোনা শেষ করে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ফিরে আসলে গর্বে ভরে যায় তার হৃদয় । ইতিমধ্যে তিনি আমেরিকা থেকে  ফিরে আসেন তার প্রিয় জন্মভূমিতে।  এবার ইচ্ছে হয় আবারও বিদেশ গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে আরো বড়ো হয়ে তার মুখ উজ্জ্বল করুক নাতিটি ।নাতিটিও দাদুর ইচ্ছে পূরণের জন্য উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে থাকে। এক সময় দাদুর ইচ্ছে পূরণের দরজা উন্মুক্ত হয় । কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডাক পেলে আনন্দ আর গর্বে ভরে মানুষটির হৃদয় । সবার কাছে নাতির বিদেশে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের বিষয়টি জানান দিয়ে বলে ওকে কানাডায় যাওয়ার ফ্লাইটে উঠিয়ে দিতে পারলেই তার দায়িত্ব পালন শেষ।

কিন্তু সব ইচ্ছে পুরণ হলেও তার শেষ ইচ্ছেটি আর পুরণ হলো না। সেদিন দুই নভেম্বর শুক্রবার সকাল বেলা  মানুষটি শারীরিক ভাবে একটু অসুস্থ বোধ করলে পাবনা হসপিটালে যান সেখানে চিকিৎসার পর ছেলেরা শহরে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকতে বললেও না থেকে ফিরে আসেন তার সারা জীবনের স্মৃতি বিজড়িত হাসামপুর গ্রামে। বাড়ি ফেরার পর আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে কাউকে কোন সুযোগ না দিয়েই দুপুর দুটোর দিকে চলে যান না ফেরার দেশে। যেখান থেকে আর কোন দিন ফিরে আসবেন না গ্রামের মানুষের দুঃখ দুর করার জন্য । গ্রামের মানুষ তাদের দুঃখের দিনে আর কখনও কোথাও খুঁজে পাবে না মানবতার আলোয় উদ্ভাসিত এই পরোপকারী এই মানুষটাকে। এই মানবিক মানুষটির নাম দীপক চন্দ্র গুহ বাড়ি পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার হাসামপুর গ্রামে । আমরা কেউ দোষত্রুটির উর্ধে নই এই মানবিক মানুষটিরও হয়তো কিছু দোষত্রুটি ছিল । তারপরও পরম করুণাময় স্রষ্টার কাছে প্রার্থণা করি তার কাছে তিনি যেন শান্তিতে রাখেন।

লেখক: মিলন কান্তি দাস, সাংবাদিক ও শিক্ষক।

মুক্তচিন্তার যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সাইটের তথ্য বা ছবি ব্যবহার করতে পারবেন, তবে সে ক্ষেত্রে তথ্য সূত্র উল্লেখ করতে হবে-সম্পাদক ঝালকাঠি সময়।