www.jhalokathisomoy.com
মুক্তচিন্তার অনলাইন সংবাদপত্র, ঝালকাঠি, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫
শিরোনাম

কামিনী রায়ের জন্ম ঠিকানায় ঝালকাঠির দাপ্তরিক স্বীকৃতি চাই

পলাশ রায় | October 12, 2018 - 1:03 pm

‘করিতে পারি না কাজ/সদা ভয়, সদা লাজ/সংশয় সংকল্প সদা টলে/পাছে লোকে কিছু বলে।’ অন্তত এই কবিতার জন্য হলেও কামিনী রায় বেঁচে থাকবেন যুগ যুগান্তে, বাঙালি বা বাঙলা সাহিত্য যত দিন টিকে থাকবে। তৎকালীন বৃটিশ ভারতের প্রথম নারী স্নাতক ডিগ্রীধারী এ মহিয়সী জন্ম নিয়েছিলেন ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোরব ঝালকাঠির বাসন্ডা গ্রামের বাসন্ডা  জমিদার পরিবারে।যদিও জমিদার বাড়িসহ কবির সে জন্মভিটা দখল করে নিয়েছে স্থানীয় একটিচক্র। বিন্দুমাত্র স্মৃতিচিহ্নও রাখেনি সেখানকার মানুষজন। প্রগতিশীল কিছু মানুষসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লোকজন বেশ কবার বাসন্ডায় কবির জন্মভিটা উদ্ধারে আন্দোলন করে আসলেও কবির তার সুফল হয়নি। একবার সে আন্দোলনে যোগ দিয়ে অনেকের সাথে আমিও লাঞ্ছিত হয়েছি।তবু ঝালকাঠি এবং বরিশালে আমরা আন্দোলন করি বেশ ক’বার।দীর্ঘ বছর পরে কমিনী রায় স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ নামে একটি সংগঠন কবির বসৎভিটা রক্ষাসহ ঝালকাঠির এ কবিকে নিয়ে নানা কর্মসূচি শুরু করেছিলো। অনেক দিন তাদের কোন কর্মসূচি দেখছিনা। জন্মভিটার সাথে কবির জন্মঠিকাটাও বেদখ হয়ে গেছে আজ দাপ্তরিক ভাবেও!

কবি কামিনী রায়ের জন্ম কোথায়? এমন প্রশ্ন করা হলে বই-পুস্তকের উদ্ধৃতি দিয়ে যে কেউ উত্তর দিবেন- বাকেরগঞ্জের বাসন্ডা গ্রামে। বর্তমান বরিশাল জেলার একটি উপজেলার নাম বাকেরগঞ্জ। কিন্তু বাকেরগঞ্জ উপজেলাটির কোথাও বাসন্ডা নামে কোন গ্রাম বা স্থান আজকের বাংলাদেশে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বৃটিশ আমলে বাকেরগঞ্জ ছিল জেলা, বরিশাল নয়। ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাকেরগঞ্জ জেলার প্রতিষ্ঠা হয়। ১৮০১ সালে জেলা সদর বাকেরগঞ্জ থেকে বরিশালে স্থানান্তর করা হয়। তৎকালীন সময়ের প্রভাবশালী জমিদার আগা বাকের খানের নামানুসারে এ জেলার নামকরন হয় বাকেরগঞ্জ। তখন থেকে কাগজপত্রে ঠিকানা উল্লেখ করতে হলে বাকেরগঞ্জের অমুক স্থান নামেই বর্তমান বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা দেশে পরিচিত হত। সেসময় বাকেরগঞ্জ জেলার আয়তন ছিল ৪,০৬৬ বর্গমাইল (১৮৭২ সাল অনুসারে) যা বর্তমান মাদারীপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালি ও ভোলা জেলা জুড়ে বিস্তৃত ছিল। সেদিনের বাকেরগঞ্জ জেলাটি আজ বরিশালের একটি উপজেলা। বাকেরগঞ্জ জেলা নামটি ১৭৯৭ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ছিল। ১৯৯৩ সালে বরিশাল বিভাগ সৃষ্টির ফলে বাকেরগঞ্জ নামটি জেলা থেকে বাদ দেয়া হয়। জেলা সদর বরিশালের নামে বিভাগের নামকরণ করা হয়। বৃটিশ যোগাযোগ আর শিল্পসংস্কৃতির উন্নয়ণে বরিশাল সদর গৌরবেই পরিচিত ছিল। তবে কাগজপত্রে লেখা হত বাকেরগঞ্জ জেলার অমুক স্থান। ঝালকাঠির বাসন্ডা গ্রামটির ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। বাসন্ডা গ্রামটি বর্তমান ঝালকাঠি শহরতলীতে অবস্থিত। বাসন্ডা নদীর পাড়ে বার্তমান নেছারাবাদ মাদ্রাসার পাশেই এ গ্রাম। গ্রামের নামেই ইউনিয়নেরও নাম বাসন্ডা। ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর বাসন্ডার তৎকালীন বাসন্ডা জমিদার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন কবি কমিনী সেন (বিয়ের পরে কমিনী রায়)। তার বাবা চন্ডীচরণ সেন বাসন্ডার ডাকসাইটে একজন জমিদার ছিলেন। পরবর্তীতে যিনি অতিরিক্ত মুন্সেফ নিযুক্ত হন। সাব জজ হিসেবেও সুনাম অর্জন করেন। ঐতিহাসিক লেখকও ছিলেন তিনি। তারই দুই মেয়ে কামিনী সেন (বিয়ের পরে কামিনী রায়) ও যামিনী সেন ঝালকাঠির বাসন্ডার ওই জমিদার বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেন। কবির স্বামী সিবিলিয়ান কেদারনাথ ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে অপঘাতে মারা যান। কবি তারপর আবারও ফিরে আসেন ঝালকাঠির বাসন্ডায় পৈত্রিক ভিটায়। তবে ১৯৪৭ সালে ভারত বর্ষ ভাগের পরে স্বপরিবার চলে যান ভারতে। আর তারপর কবির সেই জন্মভিটা জমিদার বাড়িটি স্থানীয় একটি দখলদারচক্র দখেলে নেয়। আজও বংশানুক্রমে সেই দখলদারদের কবলেই আছে ওই বাড়িটি। কবিদের সেন মঞ্জিল, পারিবারিক শ্মাশানে কবি পুত্র অশোকের সমাধী, বাড়ির দরজার ওপারে বাসন্ডা খালে বাঁধানো ঘাট- সব ঐতিহ্যই একটু একটু করে বিলিন করেছে ওই দখলদাররা। ঝালকাঠি ও বরিশালের সাংস্কৃতিক কর্মীরা বারবার আন্দোলন করে আসলেও কবির স্মৃতি রক্ষায় কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি আজও।

বৃটিশ আমলের সেদিনের বাকেরগঞ্জের বাসন্ডাই আজকের ঝালকাঠি শহরতলীর বাসন্ডা। বৃটিশের পর পাকিস্তান আর তারপর বাংলাদেশ। মহাকুমা থেকে ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঝালকাঠি পুনাঙ্গ জেলা হয়। হয়তো বাকলা বা পূর্বের ঐতিহাসিকদের লেখা পুস্তক সংশোধন করার নয়, কিন্তু দেশে বর্তমান সময়ে ছাপানো বই পুস্তকতো আর তাম্রলিপি নয়। সেটা পরিমার্জনযোগ্য। কিন্তু দু:খের বিষয় এত বছরেও তা সংশোধন হয়নি। এখনও বইপুস্তকে লেখা হয় কবি কামিনী রায়ের জন্ম বরিশালের বাকেরগঞ্জের বাসন্ডা গ্রামে। কিন্তু বাকেরগঞ্জ উপজেলায় গিয়ে কামিনী রায়ের বসত ভিটা খুঁজতে গেলে কেউ বাসন্ডা নামের গ্রামের অস্তিত্ব খুঁজে পাবেন না।

আজ কবির ১৫৪ তম জন্মবার্ষিকীতে রাষ্টের কাছে দাবী, খুব শীঘ্রই দাপ্তরিক ভাবে সংশোধন করে লেখা হোক ঝালকাঠির বাসন্ডা গ্রামে কবি কামিনী রায়ের জন্ম। আর এজন্য গেজেট প্রকাশসহ যা যা প্রয়োজনীয় তার উদ্যোগ নিতে সরকারের কাছে বিনত অনুরোধ রাখছি। নতুবা কবির জন্মভিটা বেদখ হওয়ার মত তার জন্ম ঠিকানাটাও বেদখলই থেকে যাবে! আর তার দায়ভার বড় বেদনার এবং লজ্জার…

লেখক: পলাশ রায়, সম্পাদক ঝালকাঠি সময়।

মুক্তচিন্তার যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সাইটের তথ্য বা ছবি ব্যবহার করতে পারবেন, তবে সে ক্ষেত্রে তথ্য সূত্র উল্লেখ করতে হবে-সম্পাদক ঝালকাঠি সময়।