www.jhalokathisomoy.com
মুক্তচিন্তার অনলাইন সংবাদপত্র, ঝালকাঠি, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫
শিরোনাম

‘বন্ধুত্ব‍…’

নার্গিস মুস্তারী | August 28, 2018 - 10:45 am

‘ বন্ধুত্ব ‘ শব্দের অর্থ আসলে কি ? বিশ্বাস, নির্ভরতা,ভালোবাসা, …..এই তিনের সমন্বয় যেখানে আছে  সেটাই  তো  আসল  বন্ধুত্ব !  সেখানে  থাকবে না কোন প্রতিযোগিতা থাকবে না কোন বড়াই কিম্বা লড়াই! এখন অনেক ঘটা করে বন্ধু দিবস পালিত হয় । কিন্তু এখনকার প্রজন্ম (Generation )এই লোক দেখানো বন্ধু দিবস তথা বন্ধুত্বের আসল তাৎপর্য কতটুকু জানে ? সেটা সময়ের কাছে প্রশ্ন ! আজ এই বন্ধু দিবসের প্রাক্কালে দুই বন্ধুর গল্প বলবো যারা সত্যিকার অর্থে বন্ধু !

আমার আব্বা আব্দুল বারী ও তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনোয়ার হোসেন খান। ওনাদের বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল সেই ১৯৬০কিম্বা ১৯৬২ সালে যখন ওনারা কলেজের ছাত্র ছিলেন। সেই থেকে শুরু হয়ে আজও অম্লান ! এই দীর্ঘ পথ চলায় অনেক ঝড় -ঝাপটা পার হতে হয়েছে, তবে একজন আরেকজনের পাশে থেকেছেন সবসময়। আব্বা সেই ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন । রাজনীতির কারণে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে কিন্তু কাকা সবসময় আব্বার পাশে ছায়ার মতো থেকেছেন । আব্বা যখন কলেজে পড়তেন তখন গ্রামের বাড়ি থেকে এসে ক্লাস করতেন। মনোয়ার কাকার বাড়ি থেকে টিফিন ক্যারিয়ারে করে খাবার আসতো। আর  সেই খাবার দুই বন্ধু ভাগ করে খেতেন একসাথে । দু’জনের রুচি , কর্মকাণ্ড এবং জীবন ইতিহাসের মধ্যেও রয়েছে ভীষণ মিল।মঞ্চ নাটক থেকে শুরু করে প্রবীণ বয়স পর্যন্ত অসাধারণ গান ও কবিতা লিখেছেন তারা। কর্মজীবনের শুরুতেই দুজনেই সাংবাদিকতাও করতেন।করতেন রাজনীতিও।মজার ব্যাপার ব্যক্তি জীবনেও দুজনে দুই পুত্র দুই কন্যার জনক । জীবন চলার এই দীর্ঘ পথে দুজন ছিলেন এক আত্মা, দুই দেহ !  ১৯৭৬ সালের কথা আব্বা ভীষণ অসুস্থ । তার কিডনি স্টোন ধরা পড়েছে । তীব্র ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। বরিশাল মেডিকেলে নেয়া হলো ,অপারেশন হবে । এনেশথেসিয়া দিয়েও তাঁকে কাবু করা যাচ্ছে না । অপারেশনের পর ঘোরের মধ্যে ব্যথার যন্ত্রণায় তিনি উঠে যাচ্ছিলেন তখন  কাকা আব্বাকে চেপে ধরায় তার হাতে এমন কামড় মেরেছিলেন যে হাতে দাঁতের ছাপ বসে গিয়েছিল। তবুও তিনি আব্বাকে ছাড়েননি কাকা।

আব্বা লিখতেন গান, কবিতা আর সেই গানে সুর করে করে গাইতেন কাকার ছোট ভাই খোকন কাকা ও কাকার মেয়ে পূরবী ( দুজনই তখনকার বেতারের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন )। আর যখন এই সুর দেয়া গান তোলা হতো তখন কাকার চেহারায় ভেসে উঠতো অন্য রকম এক পরিপূর্ণতা।মনে হতো তিনিই গানটি লিখেছেন । রাজনীতিবিদ হওয়াতে তাকে বিভিন্ন মিটিং এ বিভিন্ন সময়ে বক্তৃতা করতে হতো। আব্বা খুব সুন্দর করে বক্তৃতা দিতেন। আবৃত্তিও খুব ভালো করতেন । সেই সব অনুষ্ঠানের বর্ণনা কাকা এতো সুন্দর করে বলতেন শুনে মনে হতো বক্তৃতা করতো আব্বা আর তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠতো কাকার মুখে । প্রতিদিন কাকা ভোরে এসে আব্বাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে মর্নিংওয়াকে নিয়ে যেত।কোনদিন হয়তো আলসেমি করে আব্বা উঠলো না বা যেতে কাকা আমাদের টিনের চালে ঢিল ছুঁড়তো। তারপর আব্বা উঠতে বাধ্য হতেন। অনেক সময় দুইজনে বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করত। আর তখন গালাগালি থেকে শুরু করে কোন কিছুই বাদ যেতো না। আবার ঝগড়া মিটেও যেত খুব তাড়াতাড়ি কারণ বেশিক্ষণ ওনারা একজন আরেকজনের সাথে কথা না বলে থাকতে পারতেন না। মাঝে মাঝে দুজন দুজনকে বাসায় এগিয়ে দিতে।

বেশ ভালোই চলছিলো। হঠাৎ করেই আব্বার ব্রেইন স্ট্রোক হয়। আব্বা আস্তে আস্তে একটা ছোট্ট শিশুর মতো হয়ে যান । এই দুঃসময়ে কাকা প্রতিটি দিন  প্রতিটি মুহূর্ত আব্বার পাশে থেকেছেন। ডাক্তার হালকা ব্যায়াম করাতে বলেন।কাকা প্রতি দিন নির্দিষ্ট সময়ে এসে আব্বা কে ব্যায়াম করাতেন। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে কাকা রোজ আসতেন। ক্লান্ত হয়ে গেলে তার পাশে শুয়ে গান গেয়ে ঘুম পাড়াতেন । এক সময়ে বন্ধুকে জড়িয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়তেন কাকা । ঈদের সময় নামায পড়ে সবার আগে এই দুই বন্ধু কোলাকুলি করত। আব্বার সুস্থ ও অসুস্থ দুই অবস্থাতেই ………।এখনও কাকা নামায পড়ে সবার আগে যাবেন আব্বার কাছে- আব্বার কবরে! আব্বার অসুস্থ অবস্থায় তাকে অনেক দিন মেডিকেলে থাকতে হয়েছে তখন দিন নেই রাত নেই কাকা সব সময় তার বন্ধুর পাশে থেকেছেন । কাকার সেই উদ্বিগ্ন চেহারা দেখেই বুঝা যেতো কি হারাতে চলেছেন তিনি ? ২০১৪ সালে আব্বা আমাদের ছেড়ে চলে যান ! কাকার তখন একটাই কথা , “আমাকে রেখে চলে গেলি বারী “! এইত সেদিন কাকা বাইরে থেকে এসে শার্ট খুলতে খুলতে তার ছেলে সজীব কে বলছিলেন, ‘এই শার্ট টা বারীর’ এটা পড়লে ওর শরীরের গন্ধ পাই ! আব্বা মারা যাওয়ার পর আব্বার ব্যবহার করা শার্ট কাকা নিয়ে যান। প্রতিনিয়ত আব্বার কবর যিয়ারত কাকার দৈনন্দিন কাজের একটি অংশ। ঝালকাঠি না থাকায় বেশ কিছুদিন পর যিয়ারতে যান, উনি একমনে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করছিলেন হঠাৎ শুনতে পান আব্বার কণ্ঠ , ‘এতদিন পর এলি মনোয়ার ? ’

বন্ধুত্ব জয় করুক অমরত্ব …….জয় হোক বন্ধুত্বের …..চির অম্লান থাকুক এই বন্ধুত্ব !

(নার্গিস মুস্তারী/বাস/সময়)

মুক্তচিন্তার যে কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এ সাইটের তথ্য বা ছবি ব্যবহার করতে পারবেন, তবে সে ক্ষেত্রে তথ্য সূত্র উল্লেখ করতে হবে-সম্পাদক ঝালকাঠি সময়।